রাজউক নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণে সুযোগ দিয়ে পরিচালক রাজিয়া সুলতানার রমরমা ঘুষ বাণিজ্য
লিটন আলী
আপলোড সময় :
০৪-১১-২০২৬ ০২:৫১:১৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৪-১১-২০২৬ ০২:৫১:১৬ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার:
নারায়ণগঞ্জে একাধিক ভবনে নকশা লঙ্ঘন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ; ঘুষ বাণিজ্য, বিদেশ ভ্রমণ, সম্পদ অর্জন ও পদোন্নতি নিয়ে উঠেছে নানা অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৮-এর একাধিক কর্মকর্তা ও ভবনমালিকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে এসব অনিয়ম দেখেও না দেখার ভান করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে।
অন্যদিকে রাজউক জোন-৮-এর পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) রাজিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির শুরুতে যথাযথ অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ, চাকরির পরীক্ষায় নিজের বোনকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরও তাঁর পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, জোন-৮-এ রাজিয়া সুলতানার প্রভাব এতটাই বেশি যে তাঁকে সংস্থাটির ‘একাই একশো’ ক্ষমতাবান কর্মকর্তা বলেও অভিহিত করা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রাজিয়া সুলতানার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণে বাড়ছে ঝুঁকি
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াশফি ডেভেলপার লিমিটেড, সুফিয়া কমপ্লেক্স, সেন্ট্রাল প্লাজা, আছিয়া ম্যানশন, টিপিএল টাওয়ার ও কেএমএস টাওয়ারসহ একাধিক ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাড়ির মালিকদের অভিযোগ, রাজউক জোন-৮ কার্যালয়ে প্রাথমিক ছাড়পত্র থেকে শুরু করে ভবনের নকশা অনুমোদন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, আগে এসব অনিয়ম কিছুটা গোপনে হলেও বর্তমানে তা প্রকাশ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের নিয়মনীতি অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, নিয়মিত তদারকিও হচ্ছে না।
নয় তলার নকশায় ১০ তলা সুফিয়া কমপ্লেক্স
নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ার ৬৯ নম্বর প্লটে সুফিয়া কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নয়তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে ১০ তলা।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে সেন্ট্রাল প্লাজার বিরুদ্ধেও। অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনটির গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় গোডাউন তৈরি করে দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভবনের মূল অংশ থেকে নির্ধারিত দূরত্বে রাস্তা রাখার নিয়মও মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভবনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা, ট্রান্সফরমার, জেনারেটর ও বিদ্যুতের সাবস্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে ভবনগুলোর বাসিন্দা ও ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
টিপিএল ও কেএমএস টাওয়ার ঘিরে অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জে রাজউক জোন-৮-এর কার্যালয়ও টিপিএল টাওয়ারে অবস্থিত। ভবনটিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রাজউক একাধিকবার জরিমানা করলেও ভবনটির অনিয়ম সংশোধন করাতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
টিপিএল টাওয়ারের পাশেই অবস্থিত কেএমএস টাওয়ারের বিরুদ্ধেও ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সেন্ট্রাল প্লাজার মালিকের সঙ্গে কর্মকর্তাদের সম্পর্কের অভিযোগ
সেন্ট্রাল প্লাজার মালিক আলমগীরের সঙ্গে রাজউক জোন-৮-এর কয়েকজন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে ভবনমালিককে নকশাবহির্ভূত নির্মাণকাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, একই ধরনের অনিয়মে আরও দুটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ভবনগুলোর নাম, অনুমোদিত নকশা ও সংশ্লিষ্ট নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চাকরির শুরুতে বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে প্রশ্ন
রাজিয়া সুলতানা ২০১১ সালের ২৪ মার্চ রাজউকে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পরপরই যথাযথ ছুটি ও সরকারি আদেশ (জিও) ছাড়াই তিনি বিদেশ ভ্রমণ করেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১৭ মে তিনি যুক্তরাজ্যে যান। এ ভ্রমণের অনুমোদন ও ছুটিসংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজিয়া সুলতানার ধারাবাহিক বিদেশ ভ্রমণ নিয়েও রাজউকের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে। মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ভ্রমণের তথ্য উল্লেখ করেছেন কয়েকটি সূত্র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র দাবি করেছে, দেশের বাইরে রাজিয়া সুলতানার একাধিক ব্যবসায় বিনিয়োগ রয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগের কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বিদেশ ভ্রমণের নথি পর্যালোচনা করলে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে ওই সূত্রের দাবি।
সম্পদ অর্জন ও পূর্বাচলের প্লট নিয়ে অভিযোগ
রাজিয়া সুলতানার নামে ও বেনামে বিপুল সম্পদের অভিযোগ নিয়েও অনুসন্ধান চলছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি পূর্বাচলে বিশেষ ব্যবস্থায় একটি প্লট পেয়েছেন। এ ছাড়া হাজী ক্যাম্পের বিপরীতে দক্ষিণখানে তাঁর পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাটাগরিতে বরাদ্দ পাওয়া একটি প্লট কৌশলে নিজের নামে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তবে এসব সম্পদ ও প্লট বরাদ্দের বিষয়ে দলিল, বরাদ্দপত্র, আয়কর নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নথিপত্র পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বোনকে চাকরির পরীক্ষায় সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ
রাজউকের প্রশাসন বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে নিজের বোনকে সংস্থাটির চাকরির পরীক্ষায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন রাজিয়া সুলতানা—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এ ঘটনায় তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামান জড়িয়ে পড়েন এবং বিষয়টি নিয়ে সে সময় রাজউকে আলোচনা তৈরি হয়।
বর্তমানে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মুহম্মদ কামরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, বিষয়টি অনেক দিন আগের; তাঁর ঠিক মনে নেই।
তবে ওই ঘটনায় কোনো বিভাগীয় তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কিংবা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
রাজিয়া সুলতানার পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্ব পাওয়া নিয়েও রাজউকের অভ্যন্তরে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজউকে উপপরিচালক (প্রশাসন) পদে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১১টি। এর মধ্যে আটটি পদ পূরণ করা হয়েছে এবং তিনটি পদ শূন্য ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ওই শূন্য পদের বিপরীতে রাজিয়া সুলতানাকে গুরুত্বপূর্ণ জোন-৮-এর পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) পদে অনুমোদিত ১২টি পদই শূন্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এসব শূন্য পদে দায়িত্ব প্রদানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন রাজিয়া সুলতানাকে জোন-৮-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলো?
তবে পদসংখ্যা, পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিমালা এবং সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন। দায়িত্ব প্রদানের সিদ্ধান্তে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য এসব নথি গুরুত্বপূর্ণ।
পরিচালকের নীরবতা, জবাবদিহি কোথায়?
নারায়ণগঞ্জে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি এবং রাজউক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে জোন-৮-এর পরিচালক রাজিয়া সুলতানার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁকে ক্ষুদে বার্তাও পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, চাকরির শুরুতে বিদেশ ভ্রমণ, সম্পদ অর্জন, চাকরির পরীক্ষায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা এবং পদোন্নতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন, নির্মাণকাজের তদারকি এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলে এসব ক্ষেত্রে অবহেলা জননিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স